আর্থিকখাতে ছায়া ব্যাংকিং এর বিকাশ: বিশ্ব প্রেক্ষাপট

April 28, 2020
finbislesh
452
Views

আর্থিকখাতে ছায়া ব্যাংকিং এর বিকাশ: বিশ্ব প্রেক্ষাপট
অধ্যাপক শাহ্ মোঃ আহসান হাবীব
যদিও ছায়া ব্যাংকিং কার্যক্রমের পর্যবেক্ষন ও রক্ষনাবেক্ষনের প্রয়োজনীয়তা সর্বশেষ বিশ্বমন্দার পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনায় আসে। প্রকৃতপক্ষে ছায়া ব্যাংকিং ব্যবস্থা একবারে নতুন কোন বিষয় নয়। ছায়া ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাথে ব্যাংকিং খাত পরিবর্ধন এবং নিয়ন্ত্রন সরাসরি সম্পর্কিত এবং সর্বশেষ আর্থিক ও বিশ্বমন্দা পরবর্তী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে ‘ছায়া ব্যাংকিং’ ব্যবস্থা বিশেষভাবে বিতর্কের ও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠে।
ব্যাংকিং খাতে নিয়ন্ত্রণমূলক আইন ও তার প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা সর্বজন স্বীকৃত এবং ব্যাংকিং খাত সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ হবার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। বিশেষত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঝুঁিক নিয়ন্ত্রণমূলক আইন সমূহ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে নিয়মের মাঝে পরিচালিত হতে অনুপ্রানিত করে এবং অতিরিক্ত ও অহেতেুক ঝুঁকি গ্রহন থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করে। কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে যা থেকে ছায়া ব্যাংকিং তত্তে¡র সূত্রপাত ।
এই ধরনের স্বল্প নিয়ন্ত্রিত আর্থিক কার্যক্রমের পরিমাণ নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকিং কার্যক্রমের তুলনায় অনেক বেশী পরিমানে সংগঠিত হলে তা ঝুঁকিপুর্ন হতে পারে বলে বিশ্বমন্দার পরবর্তী পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষনে উঠে এসেছে। এছাড়া ব্যাংক ও ব্যাংক বহির্ভূত প্রতিষ্ঠানের আন্তঃসংযোগ সার্বিকভাবে আর্থিক খাতকে ঝুঁকিপূর্ন করে তুলতে পারে বলে বিশ্লেষকের একাংশ মনে করছেন এবং এ ধরনের কার্যক্রমকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্রিয় নজরদারীতে আনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন।
ছায়া ব্যাংকিং বা ইংরেজীতে “ঝযধফড়ি ইধহশরহম” পরিভাষাটি জনপ্রিয়টা পায় ২০০৭ সালের পর থেকে যা পল ম্যককাউলি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যালেন্সশীট বহির্ভূত আর্থিক কর্মকান্ডের ঝুঁকি প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন। এ সময় ছায়া ব্যাংকিং বলতে মূলত বোঝানো হয়েছে কিছু ঝুঁকিপূর্ন ঋন কার্যক্রমকে যা বিশ্ব (২০০৭-০৮) আর্থিক মন্দার অন্যতম মূল কারন হিসেবে সামনে আসে। এ সমস্ত ঋণ কার্যক্রম এ সময় বানিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক খাতের জন্য বড় সমস্যার কারন হয়ে দাড়িয়েছিল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে “ছায়া ব্যংকিং” এ মূল ক্যাটালিস্ট বা অনুঘটক হিসেবে আবির্ভূত হয় আর্থিক কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার ও তার উন্নয়ন। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এর ফলে আর্থিক খাত বহির্ভূত আনেক প্রতিষ্ঠান আর্থিক সেবা অতি সহজে এবং কম খরচে প্রদানের নতুন নতুন পন্থা নিয়ে আবির্ভুত হয়। আর্থিক খাত প্রতিষ্ঠান বহির্ভূত হেতু এ সমস্ত প্রতিষ্ঠানে ব্যাংক এর ন্যায় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রন নয়, যা এ ধরনের আর্থিক সেবাকে আরও সহজলভ্য ও সহজতর করে তুলেছে।
অনেকে মনে করেন “ছায়া ব্যাংকিং” সেবা আর্থিক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে কঠোর নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ করে দিচ্ছে; এবং অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক নিয়ন্ত্রন প্রবনতা ছায়া ব্যাংকিং এর বিকাশে ভ‚মিকা রাখছে। বিশেষত ব্যাংক মূলধন সংক্রান্ত কঠোর নিয়মকানুন ছায়া ব্যাংকিং কার্যক্রমে আর্থিক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সহনশীলতাকে উৎসাহিত করছে বলে মনে করা হয়। তবে “ছায়া ব্যাংকিং” এর তত্ত¡ এবং পরিধি সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়েছে এবং একই সময়ে সবক্ষেত্রে তা একভাবে আলোচিত বা সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। তাছাড়া এ সংক্রান্ত অনেক ভ্রান্ত ধারনাও প্রচলিত আছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন দেশে এবং বেশ কিছু গবেষণায় “ছায়া ব্যাংকিং” এর সংজ্ঞা ও পরিধি আলোচনায় এসেছে এবং গুরুত্ব পেয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে এ সংক্রান্ত ধারনাতত্তে¡র মিল থাকলেও, অনেক ক্ষেত্রেই বিভিন্নতা স্পষ্ট। বিশেষত আর্থিকখাতের বিভিন্ন অংশীদারী পক্ষের পরিপ্রেক্ষিতে “ছায়া ব্যাংকিং” বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত হয়েছে এবং তা কখনো অনেক সংকীর্ন এবং কখনো বা অনেক ব্যাপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে সাধারণভাবে “ছায়া ব্যাংকিং” হলো স্বল্প নিয়ন্ত্রিত আর্থিক কার্যক্রম যা অনুমোদিত কিছু প্রথাগত ব্যাংকিং কার্যক্রমের ন্যায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ তদারকী ব্যবস্থা আওতাভূক্ত নয়।
সংজ্ঞাভেদে “ছায়া ব্যাংকিং” এর পরিধি ও ভিন্নতা সংকীর্ণ থেকে বেশ ব্যাপক হতে পারে।কোন কোন ক্ষেত্রে শুধুমাত্র বিশেষ কিছু আর্থিকখাতের জটিল ঋনপন্থাকে ছায়া ব্যাংকিং এর আওতায় আনা হয়েছে। আবার কোন কোন সংজ্ঞায় প্রথাগত ব্যাংকিং খাতের বাহিরের সব আর্থিক কার্যক্রমকে “ছায়া ব্যাংকিং”এর বিধিতে অন্তুভর্‚ক্ত করা হয়েছে।
“ছায়া ব্যাংকিং” কোন বেআইনী বা অনৈতিক আর্থিক বা ব্যাংকিং কার্যক্রম নয় ।এ সমস্ত আর্থিক সেবা শুধুমা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত বা তদারকী ব্যবস্থার মধ্যে নেই এবং কখনো কখনো প্রক্রিয়াগুলো গতানুগতিক আর্থিক বা ব্যাংকিং পণ্যের তুলনায় জটিল।
বরং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে বলা যায় “ছায়া ব্যাংকিং” গতানুগতিক নিয়ন্ত্রিত ব্যাংক ব্যবস্থা যেখানে পৌছাতে পারে না “ছায়া ব্যাংকিং” সেখানে আর্থিকসেবা পৌছাতে সক্ষম। তবে “ছায়া ব্যাংকিং” এর সুবিধা কাজে লাগিয়ে স্বল্প নিয়ন্ত্রীত পণ্যের প্রসারের মাধ্যমে বানিজ্যিক ব্যাংকের মুনাফা অর্জনের প্রবনতাও লক্ষণীয়।
গতানুগতিক ব্যাংকিং ও ছায়া ব্যাংকের মাঝে পার্থক্য ও এই সংক্রান্ত স্বতন্ত্র পরিধি রেখা তৈরীর বেশ কিছু প্রচেষ্টা সত্তে¡ও তাঁদের পার্থক্য রেখা সবক্ষেত্রে স্পষ্ট নয় এবং প্রকৃতপক্ষে “ছায়া ব্যাংকিং” এর পরিধি দেশ ও ক্ষেত্র সাপেক্ষে আলাদা ও সম্ভাব্য।
বিশ্বব্যাপী উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ছায়া ব্যাংকিং এর পরিধি বিস্তার লাভ করেছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার উর্ধ্বগতি লক্ষনীয়। তবে উন্নত ও উন্নয়নশীল বা কম উন্নত দেশগুলোতে “ছায়া ব্যাংকিং” এর সংজ্ঞা, পরিধি ও প্রবনতার বেশ পার্থক্য আছে। দুই ধরনের ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ বা ক্ষেত্রগুলোতে “ছায়া ব্যাংকিং” এর সুত্রপাত ও এর বিকাশ ঘটেছে বা ঘটছে। উন্নত দেশ গুলোতে সাধারণত আর্থিক খাত গুলো অনেক পরিনত এবং ছায়া ব্যাংকিং এর মূল কার্যক্রম গুলো সেক্ষেত্রে অনেকটাই কিছু জটিল ঝুঁকি আর্থিক সেবা পণ্য। অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আর্থিক খাত অনেক ক্ষেত্রেই অপরিচিত বা স্বল্পউন্নত যেখানে একাই বড় অংশের জনগন ব্যাংকে সেবার আওতায় আসেনি সেখানে “ছায়া ব্যাংকিং” মূলত একটি সম্পূরক সেবা বা অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাংকের পাশাপাশি আর্থিক সেবা প্রদান করে চলেছে।
বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং বাজার এর প্রসার ঘটছে বেশ জোরেশোরে। সিএনএন, বিবিসির এক সাম্প্রতিক তথ্যানুসারে, সাম্প্রতিক বিশ্ব আর্থিক ও অথনৈতিক মন্দার পরবর্তী সময়ে “ছায়া ব্যাংকিং” সেবার ৭৫ ভাগ প্রসার ঘটেছে।
বেশ কিছু উন্নয়নশীল দেশে স্বল্প আয়ের মানুষ ও এ সংক্রান্ত অর্থনৈতিক খাতগুলোকে আর্থিক খাতের আওতায় আনার জন্য ছায়া ব্যাংকিং এর আওতায় বিশেষ আমানত ও ঋন পন্যের প্রচলন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে যে সমস্ত নাগরিককে প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিকখাতের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছিল না, তার সে সমস্ত আর্থিক সেবার আওতায় আসতে পারছেন । এছাড়া কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছায়া ব্যাংকিং এর আওতায় অনলাইন এর সুযোগ কাজে লাগিয়ে (পি টু পি ) আমানতকারী ও বিনিয়োগকারী সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমো ঋন সরবরাহ বা গ্রহন করতে পারছেন। তবে এধরনের আর্থিক সেবা এখনও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরে সার্বজনীন আর্থিক সেবা হিসেবে প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেনি। ছায়া ব্যাংকিং এর আওতায় বিভিন্ন ধরনের সেবা পন্যের বিন্যাস বিবেচনায় বলা যায় যে, উন্নয়নশীল দেশের ছায়া ব্যাংকিং এর আর্থিক সেবাসমূহ সাধারনত উন্নত দেশের তুলনায় কম জটিল এবং এর ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ভিন্নতা স্পষ্ট। ছায়া ব্যাংকিং এর শংকার ব্যাপারটি সাম্প্রতিক বিশ্বমন্দার পরিপ্রেক্ষিতে উঠে এসেছিল কারন ঋন এবং এসংক্রান্ত সময়ের রূপান্তর অনেক ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে এবং বেশ কিছু ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। বিশেষত স্বল্পকালীন আমানত বা সম্পদের বিপরীতে দীর্ঘকালীন ঋন এর প্রসার সম্পদ-দায় ও তারল্য সংক্রান্ত ঝুঁকি তৈরি করেছিল আর তার ফলে সৃষ্ট বিশ্ব আর্থিক মন্দা পরবর্তীতে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দাতে রূপ নিয়েছে। আর এ কারনেই ছায়া ব্যাংকিংকে অনেক ক্ষেত্রেই আর্থিক অস্থিতিশীলতার সম্ভাব্য কারন হিসেবে গন্য করা শুরু করেছে এখাতের অনেক বিশেষজ্ঞ মহল। মনে করা হয়, কোন কোনো ক্ষেত্রে ছায়া ব্যাংকিং এর বিস্তার খুব সহজে আর্থিক খাতে অস্থিতিশীলতার জন্ম দিতে পারে এবং পুরো অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ছায়া ব্যাংকিং কার্যক্রম যেহেতু কঠোর নজরদারিতে থাকে না, এ কারনে এ সংক্রান্ত দুর্বলতা ও অস্থিতিশীলতার লক্ষনগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে প্রকট হয় না। তবে উন্নয়নশীল দেশে যেভাবে ছায়া ব্যাংকিং এর বিকাশ ঘটছে, সেক্ষেত্রে এধরনের শংকা সবসময় গ্রহনযোগ্য মনে হয় না। একথা অনস্বীকার্য যে, যেকোন দেশেই ছায়া ব্যাংকিং এর আওতা ও পরিধি পরিমাপ করা প্রয়োজন এবং তার একটি ন্যুনতম নজরদারির নীতি ও কৌশল নির্ধারণ করা দরকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *