‘ব্যাংক মালিক’ শব্দটি বিভ্রান্তিকর, ‘ব্যাংক উদ্যোক্তা’ ব্যবহার বাঞ্ছনীয়

April 28, 2020
finbislesh
371
Views

‘ব্যাংক মালিক’ শব্দটি বিভ্রান্তিকর, ‘ব্যাংক উদ্যোক্তা’ ব্যবহার বাঞ্ছনীয়
(বর্ণিক বার্তায় ২০১৮ সালে প্রকাশিত)
-ড. শাহ্ মোঃ আহসান হাবীব
‘ব্যাংক মালিক’, ‘ব্যাংক মালিকবৃন্দ’, ‘ব্যাংক মালিকগণ’ এই শব্দগুলো প্রতিনিয়ত দৈনিক পত্রিকা বা টেলিভিশনের পর্দায় দেখা যায়। এই শব্দগুলো দিয়ে বোঝানো হয় ব্যাংকের পরিচালক, চেয়ারম্যান বা তাদের সম্মিলিত পক্ষ বা দলকে। প্রকৃতপক্ষে এই শব্দগুলো অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর-যা তত্ত¡¡গত এবং বাস্তবতার দিক থেকে মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। এছাড়া এ শব্দগুলো ব্যাংক সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অন্তরায় বা বিভ্রান্তির সুষ্টি করতে পারে সাধারণ মানুষের মাঝে। শব্দগুলোর মাঝে ব্যাংক পরিচালনার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা নয়, বরং ক্ষমতা বা অধিকারবোধের বিষয়টি বিশেষভাবে প্রকাশিত হয়।

সাধারণভাবে কোন শিল্প বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিক বলতে তাঁর শেয়ারহোল্ডারদের বোঝানো হয়। যারা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন ও ঝুঁকি গ্রহণ করেন। একটি প্রতিষ্ঠানের ভাল ফলাফলের পাশাপাশি এই ব্যক্তিবর্গ যে কোন খারাপ ফলাফলের দায়ভারও বহন করেন, বা করতে বাধ্য হন। সাধারণভাবে এ ধরণের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় না। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সঠিক দায়দায়িত্ব মূলতঃ উদ্যোক্তা বা শেয়ার হোল্ডাররা নিজেরাই করে থাকেন বা করার অধিকার রাখেন। মালিক, মালিকগণ এ ধরণের শব্দগুলো এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা/ শেয়ার হোল্ডার, পরিচালক এবং চেয়ারম্যানদের জন্য প্রযোজ্য হয়ে থাকে।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই শব্দগুলো মোটেই প্রযোজ্য নয়। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনার ক্ষেত্রে অর্থের মূল উৎস হলো আমানত বা ডিপোজিট- যা সাধারণ মানুষের কাছে সংগ্রহ করা হয়। সেক্ষেত্রে অর্থের সামান্যই উদ্যোক্তা বা পরিচালকদের কাছ থেকে আসে। সেক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র পরিচালক বা পর্ষদের সিদ্ধান্ত ও নিয়ন্ত্রণ আমাতকারীদের স্বার্থের সংরক্ষণ নাও করতে পারে। আর এ জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি কেন্দ্রীয় বাংকের নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়, যেন কোনভাবেই ব্যাংক উদ্যোক্তা বা একটি ক্ষুদ্র অর্থ সরবরাহকারী গোষ্ঠী আমানতকারীদের স্বার্থ বিরোধী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে না পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যাংক নিয়ন্ত্রণেরু একটি মূল লক্ষ্য হলো আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার নজরদারী করা। সাম্প্রতিক বিশ্ব মন্দার কারণ হিসেবে অনেক ক্ষেত্রেই পরিচালনা পর্ষদের ঝুঁকি গ্রহণকে দায়ী করা হয়েছে যা আমানতকারীদের স্বার্থের অন্তরায়। এ প্রেক্ষিতে বেশ কিছু কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও নজরদারী প্রতিষ্ঠানের দূর্বলতার প্রতিও অঙ্গুলী নির্দেশ করা হয়েছে। এ কারণে বর্তমানে ব্যাংক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণকে অধিক গুরুত্ব প্রদান করা হচ্ছে।

যে কোন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিচালক বা চেয়ারম্যান তার সার্বিক ব্যবস্থাপনায় সরাসরি অংশগ্রহণ, নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন। একই ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত থাকতে পারেন। কিন্তু ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সেক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনাকে একটি সীমারেখার মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মনীতি অনুসারে পরিচালিত হতে হয়। বরং এক্ষেত্রে ব্যাংক ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা পর্ষদের মাঝে একটি সুস্পষ্ট রেখা বা দূরত্ব মেনে চলা সুশাসনের জন্য অত্যন্ত জরুরী।

ব্যাংক সুশাসনের আওতায় সাধারণভাবে ব্যাংকের পরিচালকবৃন্দ একটি সঠিক নিয়মের মাঝে নীতি নির্ধারণের দায়িত্ব পালন করবেন এবং প্রতিষ্ঠানকে দিকনির্দেশনা প্রদান করবেন। দৈনন্দিন কাজে তাদের অংশগ্রহণ ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হিসেবে কাজ করে। বরং অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের নিস্পৃহতাই কাম্য হতে পারে। সেক্ষেত্রে পরিচালকবৃন্দের নির্দিষ্ট সীমা, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ, সীমিত অধিকার ও ুদায়ভার বোঝানোর ক্ষেত্রে ‘মালিক’ বা ‘মালিক পক্ষ’ শব্দগুলো ভুল নির্দেশনা দিতে পারে।

বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে একটি পর্ষদ বা শেয়ার হোল্ডাররা তাদের ভবিষ্যৎ পথ চলা, পণ্য উৎপাদন, সম্প্রসারণ ইত্যাদির ক্ষেত্রে মূলতঃ বাজার নির্দেশনা মেনে চলেন। আর্থিক খাতে ব্যাংকিং সেবার বাজারের পাশাপশি অংশীদারী পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণ একটি বড় বিষয়। ব্যাংক এর অংশীদারী পক্ষ শুধু পরিচালকবৃন্দ নন। বরং মূল পক্ষ হলো আমানতকারী। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সরকার, ব্যাংক ব্যবস্থাপনা ও সমাজের স্বার্থও সংরক্ষণ করে ব্যাংক পরিচালনা করতে হয়। যদি ব্যাংকের দূঃসময়ে সাধারণ করদাতার আর্থিক সহযোগিতা কাম্য হয়, তবে ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা ব্যাংক ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার একটি অন্যতম অনুষঙ্গ হওয়াই স্বাভাবিক।

যে কোন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদকে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার নিয়ম ও নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েই অন্যান্য অংশীদারী পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণ করে চলতে হয়। ইচ্ছে মত আগ্রাসী ব্যাংকিং, অতি সম্প্রসারণ, অতি ঝুঁকি গ্রহণ এবং স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্য অর্জনে অধিক গুরুত্ব প্রদান অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে স্বল্পকালীন লক্ষ্য অর্জনে আগ্রাসী ব্যাংকিং অপরাধের শামিল। সুশাসনের সংস্কৃতি ও অনুশীলন ব্যাংকিং খাতের সার্বিক উন্নয়নের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্বশীল ও নিয়মতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনুশীলন একটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রণী ভ‚মিকা রাখে।

বিশ্বের সবশেষ আর্থিক মন্দার কারণ হিসেবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুশাসনের অভাবকে দায়ী করা হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এমনকি অনেক উন্নত দেশেও ব্যাংক সুশাসনের অভাবে আর্থিক খাত বার বার ক্ষতির মুখে পড়েছে। মুনাফার অতি লোভ এবং তা অর্জনে অযৌক্তিক ঝুঁকি গ্রহণ ব্যাংক সুশাসন প্রতিষ্ঠার একটি বড় বাঁধা। এটি একটি সার্বিক সমস্যা। সারা বিশ্বে ব্যাংক সুশাসনের অভাব ও প্রয়োজনীয়তা সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত।

বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বেশ কিছু জটিল সমস্যা কাটিয়ে ভবিষ্যৎ পথ চলার নির্দেশনা খুঁজছে। আপাতঃদৃষ্টিতে বর্তমান অবস্থার ভাল দিক হলো, আমরা ব্যাংক খাতের সার্বিক ঝুঁকি ও বাস্তবতাগুলো আলোচনায় আনছি যা ভবিষ্যৎ দিক নির্দেশনা খুুঁজে পাওয়ার জন্য অত্যন্ত জরুরী। একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, আমাদের অনেক সমস্যার সমাধান লুকিয়ে আছে সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাঝে। পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্বশীল আচরণ এবং তুলনামুলক ভাল সুশাসন অনুশীলন দেশের কিছু ব্যাংকের জন্য সফলতা বয়ে এনছে-যা অন্যদেন জন্য উদাহরণ হতে পারে। ুব নির্দিষ্ট করে বলা যায়, পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্বশীল, নিয়মতান্ত্রিক ও আমানতকারীসহ অন্যান্য অংশীদারী পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণমূলক আচরণ ব্যাংকিং খাতের সমস্যা সমাধানের মহৌষধ।

একথা ঠিক যে, একদল উদ্যোক্তার প্রচেষ্টায় একটি ব্যাংক তার কার্যক্রম শুরু করে এবং প্রাথমিকভাবে তাদের অর্থেই প্রতিষ্ঠানটি বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়। এরপর ধীরে ধীরে একটি ব্যাংক দেশের ব্যাষ্টিক ও সমষ্টিক উন্নয়ন ধারার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যায়। এরকম একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যাংক কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের সম্পত্তি নয়। বরং দেশ ও সাধারণ জনগণের সম্পদ। আর এ জন্য বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন দেশে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক দূর্দশা থেকে বাঁচাতে সাধারণ মানুষ প্রদত্ত করের অর্থ ব্যয় করার অসংখ্য নজির রয়েছে। সরকারী বা বেসরকারী যাই হোক প্রকৃতপক্ষে ব্যাংকের মালিক দেশ ও দেশের মানুষ। এ ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের সীমিত কার্যক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে ‘মালিক’ বা ‘মালিক পক্ষ’ নয়, ‘ব্যাংক উদ্যোক্তা’ বা ‘ব্যাংক উদ্যোক্তা পক্ষ’ শব্দগুলো ব্যবহার বাঞ্ছনীয় ও গ্রহণযোগ্য।

লেখক বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব্ ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) এর অধ্যাপক ও পরিচালক (প্রশিক্ষণ)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *