ক্ষুদ্র শিল্প অর্থায়নে এস এম ই ক্লাস্টার বা আন্তঃসংযুক্ততা

July 27, 2021
130
Views

এসএমই অর্থায়নের কৌশল হিসেবে গ্রিন ক্লাস্টার

ড. শাহ মো. আহসান হাবীবমে ০৩, ২০২১

‘ক্লাস্টারিং’   বা  ‘আন্তঃসংযুক্ততা’ প্রতিযোগিতা এবং সহযোগিতার মাধ্যমে এসএমই বা ক্ষুদ্র শিল্পকে শক্তিশালী ও একীকরণের একটি স্বীকৃত কৌশল। নীতিনির্ধারকরা ক্লাস্টারভিত্তিক এসএমই বিকাশের কৌশল গ্রহণ করে ক্ষুদ্র শিল্প খাতকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিতে পারেন, যা উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কভিড মন্দার প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্র শিল্প খাতে বৃহত্তর সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা, ছোট  ব্যাবসায়ীদের দ্বারা সম্মিলিত আচরণ, দুঃসময়ে বিশেষ তহবিলের প্রয়োজনীয়তা এবং  ব্যবসায়িক ক্রিয়াকলাপে পরিবেশগত ঝুঁকির মোকাবেলা ক্লাস্টারিং বা  আন্তঃসংযুক্ততা  বিষয়টিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে এসএমইগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে  থাকা এসএমইগুলোকে সহযোগিতা করা, সময়মতো তাদের কাছে পৌঁছানো এবং এ দুঃসময়ে তাদের বাঁচিয়ে রাখা নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ক্লাস্টার বা আন্তঃসংযুক্ত দল হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করলে নীতিনির্ধারকরা সহজে এ ক্ষুদ্র শিল্পগুলোর সমস্যা ও সংকট সম্পর্কে অবগত হতে পারতেন এবং তাদের সহযোগিতা করা সহজ হতো। ক্ষুদ্র শিল্প বা এসএমইর দৃষ্টিকোণ থেকে আন্তঃসংযুক্ততা যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা, একসঙ্গে কাজ করা এবং অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংঘবদ্ধভাবে নিজেদের উপস্থাপনের সুযোগ করে দেয়। কভিড যুগ বা নিউ নরমাল পরিস্থিতিতে ক্লাস্টার বিকাশ কৌশলটিতে ঐতিহ্যগত মানদণ্ডের সঙ্গে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, জরুরি তহবিল গঠন এবং পরিবেশগত ঝুঁকি নিরসনের প্রচেষ্টা বিশেষভাবে সম্পৃক্ত হওয়া উচিত। কভিড মহামারীর প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য এ ধরনের সংকট মোকাবেলার জন্য পরিবেশের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে ক্ষুদ্র শিল্পায়নের ভাবনা যুক্তিপূর্ণ। এ অবস্থায় ‘গ্রিন এসএমই ক্লাস্টার’ বা ‘পরিবেশবান্ধব ক্ষুদ্র শিল্প আন্তঃসংযুক্ততা’ আগামী দিনের সত্যিকারের টেকসই এসএমই কৌশল হতে পারে।

ক্লাস্টারিং বা আন্তঃসংযুক্ততা বিষয়টি সম্পর্কে বিভ্রান্তি আছে। কেবল বেশ কয়েকটি অনুরূপ এসএমই ইউনিট একসঙ্গে থাকা বা এসএমই সমাবেশ  ক্লাস্টার গঠনের পর্যাপ্ত শর্ত নয়। একটি ক্লাস্টার গড়ে তোলার মূল মানদণ্ড তিনটি—আন্তঃসংযোগ, প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা। এ তিনটি মানদণ্ড অর্জনের মাধ্যমে যে ক্ষুদ্র দল বা ক্লাস্টার গঠিত হয়, তা দিয়ে অনেক কিছু অর্জন সম্ভব।

একসঙ্গে অনেকগুলো এসএমই ইউনিট থাকা মানেই তাদের মাঝে সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতা আছে এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। ক্লাস্টারের আশানুরূপ ফল অর্জনের জন্য এ মানদণ্ডগুলো অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি। সাধারণত এসব মানদণ্ড স্বতঃস্ফূর্তভাবে অর্জনের সম্ভাবনা কম, বরং নীতিনির্ধারক এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডারের সুবিধার্থে এসএমই ক্লাস্টারগুলোর বিকাশের জন্য কার্যকরভাবে হস্তক্ষেপ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষুদ্র শিল্পের স্বীকৃত সমস্যা অর্থাৎ অপর্যাপ্ত গ্রহণযোগ্য তথ্য, অপর্যাপ্ত সম্পদ এবং  বাজারের অনুপস্থিতির জটিলতা থেকে উদ্ভূত ক্ষুদ্র শিল্পের অর্থায়ন সমস্যা কাটিয়ে  উঠতে  এ ক্লাস্টারগুলো খুব কার্যকর হতে পারে। নীতিনির্ধারকদের পাশাপাশি এসএমই অর্থায়ন প্রক্রিয়াটির মূল অংশীদার হিসেবে  এসএমই ক্লাস্টার বিকাশে অবদান রাখতে ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে।

ক্লাস্টার  বিকাশের বিষয়ে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে তত্ত্বগত ধারণারও পরিবর্তন ঘটেছে। সংজ্ঞার বিবেচনায় ‘ভৌগোলিক সান্নিধ্য’ বিষয়ে বিতর্ক সুস্পষ্ট। আজকের ক্লাস্টার গবেষণা ও নীতিমালায় একটি শহর,  এমনকি প্রদেশ/রাজ্য একটি আন্তঃসংযুক্ত ক্লাস্টার হতে পারে, যেখানে প্রযুক্তি সংযোগের মাধ্যম হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। অবশ্য  অবস্থানগত  সান্নিধ্যের সুবিধা অস্বীকার করা যায় না। তবে কোনো সন্দেহ নেই যে কেবল ভৌগোলিক সান্নিধ্য ক্ষুদ্র শিল্পের সমস্যা সমাধানে  কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারে না।

গঠন ও বিকাশের দিক থেকে এসএমই ক্লাস্টার প্রাকৃতিক (সিলিকন ভ্যালির ইলেকট্রনিকস ক্লাস্টারের মতো) হতে পারে, যা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বৃদ্ধি পায় বা সরকার ক্লাস্টার তৈরি করতে পারে (যেমন রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো), যা বিশেষ উদ্দেশ্যে  প্রতিষ্ঠা করা হয়। বিশ্বাস, সহযোগিতা এবং জ্ঞানের প্রচ্ছন্ন প্রবাহের মতো মূল কার্যকরী উপাদানগুলো  প্রাকৃতিক ক্লাস্টারে শক্তিশালী হয়, যা টেকসই উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী। তবে সরকারের তৈরি ক্লাস্টারের পেছনে মূল যুক্তিটি হলো, একই খাতে বিচ্ছিন্নভাবে  পরিচালিত ক্ষুদ্র শিল্পকে স্বল্প সময়ে উন্নয়নের ধারায় নিয়ে আসা এবং অর্থনৈতিক লক্ষ্য  অর্জনে সম্পৃক্ত করা।

বাংলাদেশে ২০১৩ সালে ভৌগোলিকভাবে কেন্দ্রীভূত ‘এসএমই ক্লাস্টার’ চিহ্নিত করেছে  এসএমই ফাউন্ডেশন। ক্ষুদ্র শিল্পের আন্তঃসংযুক্ততা বিকাশের পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রাথমিক  পদক্ষেপ মাত্র। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্ষুদ্র শিল্পের অর্থায়ন সুযোগ সৃষ্টিতে বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে, আর  এসএমই ক্লাস্টার বা ক্ষুদ্র শিল্পের আন্তঃসংযুক্ততা বিকাশের মাধ্যমে সে লক্ষ্য অর্জনের পথে অনেক এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। তবে সেক্ষেত্রে শুধু ‘এসএমই ক্লাস্টার’ চিহ্নিতকরণ বা স্বল্পকালীন কৌশল কাঙ্ক্ষিত  ফল বয়ে আনবে না। এ অবস্থায় কভিড-১৯ মহামারী ও বিশ্বমন্দা এসএমই ক্লাস্টার বিকাশের পথে পরিবেশের ঝুঁকি বিবেচনায় নেয়ার প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে বিশ্বের টেকসই উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যকর প্রজন্ম নিশ্চিত করতে হলে সব ধরনের উন্নয়ন পন্থায় পরিবেশের ঝুঁকি বিবেচনায় নেয়ার বিকল্প নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের বিকাশে জোরেশোরে কাজ করে যাচ্ছে ২০১১ সাল থেকে। ‘গ্রিন এসএমই   ক্লাস্টার’ বা ক্ষুদ্র শিল্পে পরিবেশবান্ধব আন্তঃসংযুক্ততা বিকাশের মাধ্যমে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘এসএমই অর্থায়ন’ এবং ‘পরিবেশবান্ধব অর্থায়ন’-সংক্রান্ত দুটি লক্ষ্য অর্জনের পথে একযোগে কাজ করতে পারে।

এসএমই খাত এবং এর অর্থায়নে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের অনেক ক্ষুদ্র শিল্প এখনো অনানুষ্ঠানিক ঋণ উেসর ওপর নির্ভর করে। তবে প্রচেষ্টা চলছে এবং অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও এসএমই অর্থায়নের বাজার ও ঋণ  প্রক্রিয়া উন্নত এবং সহজতর হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের এসএমই উন্নয়নে সক্রিয় রয়েছে এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যাংক থেকে যথেষ্ট পরিমাণ এসএমই ঋণের প্রবাহ সৃষ্টিতে সমর্থনমূলক নীতি ও  কৌশল গ্রহণ করে আসছে। ‘এসএমই ক্লাস্টারভিত্তিক উন্নয়ন’ বাংলাদেশ সরকারের এসএমই নীতিমালা ২০১৮-তে কৌশলগত লক্ষ্যের অংশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে এসএমই ফাউন্ডেশন সার্বিকভাবে এসএমই প্রসার এবং এসএমই ক্লাস্টার বিকাশে কিছু উল্লেখযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তবে চিহ্নিত ও ভৌগোলিকভাবে কেন্দ্রীভূত এসএমই ক্লাস্টারগুলো কতটা  কার্যকর, অর্থাৎ  আন্তঃসংযুক্ততা,  প্রতিযোগিতা এবং সহযোগিতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারছে কিনা, তা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। মূল্যায়নের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে চিহ্নিত ভৌগোলিকভাবে কেন্দ্রীভূত এসএমই  ক্লাস্টারগুলো বিকাশের কোন স্তরে আছে এবং কার্যকর স্তরে উন্নীত করতে হলে কী কী  ধরনের পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। চিহ্নিত এসএমই ক্লাস্টারগুলোকে যথাযথ নীতিগত ও কৌশলগত সহযোগিতা কাঠামোর আওতায় কার্যকর ক্লাস্টারে উন্নীত করার মাধ্যমে টেকসই ক্ষুদ্র শিল্প অর্থায়নে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাতে পারে দেশের আনুষ্ঠানিক আর্থিক খাত।

‘এসএমই ক্লাস্টারভিত্তিক অর্থায়ন’ এবং ‘চিহ্নিত ও ভৌগোলিকভাবে কেন্দ্রীভূত এসএমই ক্লাস্টারে এসএমই অর্থায়ন’ এক কথা নয়।  এসএমই ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘এসএমই  ক্লাস্টারভিত্তিক অর্থায়ন’ মডেল অনুসরণের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তবে বেশির ভাগ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এখনো সে পথে অগ্রসর হতে পারেনি। প্রকৃতপক্ষে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো একক প্রচেষ্টায় ‘এসএমই ক্লাস্টারভিত্তিক  অর্থায়ন’ মডেলের অবাধ বাস্তবায়ন করতে পারবে না। এজন্য দরকার সমন্বিত উদ্যোগ। সার্বিক এসএমই  নীতিমালার আওতায় ক্লাস্টারভিত্তিক এসএমই উন্নয়ন সহজ নয়। এসএমই ক্লাস্টারের বিকাশে আলাদা জাতীয় নীতিমালা প্রয়োজন, যার ভিত্তিতে তৈরি হতে হবে এসএমই ক্লাস্টার চিহ্নিতকরণ, উন্নতকরণ, কার্যকর স্তর মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয়  সহযোগিতা কাঠামোসংক্রান্ত কৌশল নির্ধারণ ও তার বাস্তবায়ন। তেমনি ‘এসএমই অর্থায়ন নীতিমালা’র আওতায় নয়, বরং আলাদা ‘এসএমই  ক্লাস্টার   অর্থায়ন নীতিমালা’ প্রয়োজন, যার আওতায় ‘এসএমই ক্লাস্টারভিত্তিক অর্থায়ন’ বাস্তবায়নে প্রচেষ্টা চালানো প্রয়োজন।  জাতীয় পর্যায়ে যথাযথ কাঠামোর আওতায় কার্যকর এসএমই ক্লাস্টারের বিকাশ করা  সম্ভব হলে ‘এসএমই ক্লাস্টারভিত্তিক অর্থায়নে’র মাধ্যমে দেশের এসএমই তথা ক্ষুদ্র শিল্প খাতের ঋণ সমস্যাসহ অন্যান্য সমস্যা সমাধান সহজ হবে। আর কভিড যুগে এসএমই ক্লাস্টার বা আন্তঃসংযুক্ততা বিকাশ হতে হবে পরিবেশবান্ধব  এবং এসএমই ক্লাস্টারভিত্তিক অর্থায়ন হতে হবে পরিবেশবান্ধব বা সবুজ অর্থায়ন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *