দেশের ব্যাংক খাত ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজার বর্তমানে একাধিক কাঠামোগত ও নীতিগত চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট, ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্যের দুর্বলতা, আস্থার ঘাটতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ-এই সবকিছু মিলিয়ে আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এর পাশাপাশি বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় অনিশ্চয়তা, নীতির ঘনঘন পরিবর্তন এবং বৈদেশিক লেনদেনে অপ্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলের বিস্তার বৈদেশিক মুদ্রাবাজারকে আরও অস্থির করে তুলছে। এই বাস্তবতায় একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে- ব্যাংকিং খাত ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত দুই প্রধান অনুষঙ্গ, অর্থাৎ ক্ষুদ্র আমানতকারী ও প্রবাসী রেমিট্যান্স প্রেরণকারীদের স্বার্থ, আস্থা ও সুরক্ষা নিশ্চিত না করলে কোনো সংস্কার উদ্যোগই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না।
দেশের আর্থিক ব্যবস্থার মূলভিত্তি দুটি শক্ত স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে-ব্যাংক খাত এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজার। এই দুই খাতের কার্যকারিতা নির্ভর করে জনগণের আস্থা, নিয়মিত তহবিল প্রবাহ এবং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার ওপর। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, এই খাতগুলোর সবচেয়ে নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য অবদানকারীরা অর্থাৎ ক্ষুদ্র আমানতকারী এবং প্রবাসী শ্রমজীবী রেমিট্যান্স প্রেরণকারীরা নীতিগত অগ্রাধিকার, প্রণোদনা ও সুরক্ষার ক্ষেত্রে প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যান।
ব্যাংক খাতের প্রকৃত শক্তি কোনোভাবেই বড় করপোরেট গ্রাহক বা স্বল্পসংখ্যক উচ্চমূল্যের আমানতকারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং দেশের লাখো ক্ষুদ্র আমানতকারীর নিয়মিত সঞ্চয়ই ব্যাংকগুলোর তহবিলের প্রধান উৎস। কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নিম্ন ও মধ্য আয়ের চাকরিজীবী, প্রবাসীর পরিবার এবং অবসরপ্রাপ্ত মানুষরা সবাই ব্যাংকে সঞ্চয় রেখে অর্থনীতির প্রবাহ সচল রাখেন। এই আমানতই ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করে, বিনিয়োগ বাড়ায় এবং উৎপাদন ও কর্মসংস্থানকে সহায়তা করে। অন্য কথায়, ব্যাংকিং খাত কার্যত জনগণের অর্থের ওপর দাঁড়িয়ে পরিচালিত হয়। ফলে ব্যাংকগুলো কেবল একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং জনগণের অর্থ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ আস্থাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান।
এই প্রেক্ষাপটে ব্যাংকগুলোর জবাবদিহির প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন ব্যাংকগুলো আমানতকারীর অর্থ ব্যবহার করে ঋণ দেয়, বিনিয়োগ করে এবং ঝুঁকি গ্রহণ করে, তখন সেই সিদ্ধান্তের দায়ও তাদের বহন করতে হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ঋণ ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা, রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের চাপ, দুর্বল ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং অভ্যন্তরীণ সুশাসনের ঘাটতির কারণে বিপুল পরিমাণ ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়। এই ক্ষতির বোঝা সরাসরি ব্যাংক ব্যবস্থাপনা বা বড় ঋণগ্রহীতারা বহন করেন না; বরং তা ঘুরে ফিরে পড়ে সাধারণ আমানতকারী ও শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ওপর।
একদিকে ব্যাংকগুলো বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য বিশেষ সুদহার, পুনঃতফসিল, ঋণ পুনর্গঠন ও নানামুখী নীতিগত সুবিধা দেয়, অন্যদিকে ক্ষুদ্র আমানতের ওপর সুদহার তুলনামূলকভাবে কম থাকে এবং নানা ধরনের চার্জ আরোপ করা হয়। এই বৈষম্য দীর্ঘদিন ধরে চলমান। এতে একটি বিপজ্জনক বার্তা ছড়ায়, যারা বেশি ঝুঁকি নেয় এবং বেশি ব্যর্থ হয়, তারা বেশি সুবিধা পায়; আর যারা নিয়ম মেনে সঞ্চয় করে, তারা তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত থাকে। এই বাস্তবতা ক্ষুদ্র আমানতকারীর সঞ্চয়ে আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে, যা ব্যাংক খাতের তারল্য ও স্থিতিশীলতার জন্য দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে।
ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণের দীর্ঘস্থায়ী সংকট এই সমস্যাকে আরও গভীর করে তুলেছে। প্রভাবশালী ঋণখেলাপিরা বিভিন্ন সুযোগ, পুনঃতফসিল ও নীতিগত শিথিলতার মাধ্যমে দায় এড়িয়ে যেতে সক্ষম হন। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহির দুর্বলতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সীমিত বা অসম প্রয়োগ এই প্রবণতাকে উৎসাহিত করে। এর ফলে ব্যাংকের মূলধন ক্ষয় হয়, প্রভিশনিং চাপ বাড়ে এবং তারল্য সংকট সৃষ্টি হয়। শেষ পর্যন্ত এই সংকটের বোঝা এসে পড়ে সাধারণ আমানতকারীর ওপর, যাদের সঞ্চয়ই ব্যাংকের প্রধান ভরসা। এটি কেবল আর্থিক ব্যর্থতা নয়, বরং সুশাসন, নৈতিকতা ও নীতিগত দৃঢ়তার অভাবেরও প্রতিফলন।
এখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা ও দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকগুলো যখন সংকটে পড়ে, তখন প্রায়শই সরকারি তহবিল, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা বা নানামুখী প্রণোদনার মাধ্যমে সেগুলো টিকিয়ে রাখা হয়। অর্থাৎ, শেষ পর্যন্ত জনগণের করের অর্থ বা রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদ ব্যবহার করেই ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা হয়। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে- যদি ব্যাংকগুলো জনগণের অর্থে পরিচালিত ও সংকটে উদ্ধারপ্রাপ্ত হয়, তাহলে তাদের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা কেন সেই মাত্রায় নিশ্চিত করা হবে না? ব্যাংক ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা পর্ষদ এবং বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য স্পষ্ট দায় নির্ধারণ ও শাস্তির ব্যবস্থা না থাকলে এই সংকট বারবার ফিরে আসার ঝুঁকি থেকেই যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক খাতে কিছু সংস্কার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে-তদারকি জোরদার, ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি, মূলধন পর্যাপ্ততা বাড়ানোর চেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক মান অনুসরণের প্রচেষ্টা। এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে সমস্যা হলো, এসব সংস্কারের বাস্তব সুফল এখনো সাধারণ আমানতকারীর আস্থা ও নিরাপত্তায় স্পষ্টভাবে এখনো প্রতিফলিত হয়নি। খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় যদি স্বচ্ছতা, সমতা ও কঠোরতা নিশ্চিত না হয়, এবং ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার জন্য প্রকৃত দায় নির্ধারণ না করা হয়, তাহলে সংস্কার উদ্যোগগুলো কাগজে সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি থেকেই যায়।
আমানত সুরক্ষার বিষয়টি এখন কেবল আমানত বীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। আমানত বীমা একটি প্রাথমিক সুরক্ষা দিলেও, তা সব ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়। ব্যাংক দেউলিয়া হলে দ্রুত ও কার্যকর ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা, দুর্বল ব্যাংক আগেভাগে চিহ্নিত করে হস্তক্ষেপ, গ্রাহক অভিযোগ নিষ্পত্তিতে স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রক্রিয়া এবং ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। আমানতকারীর অর্থ যেন কোনোভাবেই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, অব্যবস্থাপনা বা নীতিগত ব্যর্থতার কারণে ঝুঁকিতে না পড়ে, এই নিশ্চয়তা রাষ্ট্র ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেই দিতে হবে।
ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতার সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আর্থিক সাক্ষরতা ও সচেতনতা। দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী এখনো ব্যাংক পণ্য, সুদহার, ঝুঁকি, গ্রাহক অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে পর্যাপ্তভাবে অবগত নয়। ফলে তারা অনেক সময় ভুল সিদ্ধান্ত নেন বা প্রতারণার শিকার হন। বর্তমানে যেসব আর্থিক সাক্ষরতা কর্মসূচি নেওয়া হয়, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকতা ও সীমিত পরিসরের মধ্যে আবদ্ধ থাকে। অথচ স্কুল, কলেজ, গ্রাম ও প্রান্তিক পর্যায়ে সহজ ভাষায় ধারাবাহিক আর্থিক শিক্ষা ও সচেতনতা কার্যক্রম ছাড়া একটি শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল ব্যাংকিং সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা সরাসরি নির্ভর করে প্রবাসী রেমিট্যান্স প্রেরণকারীদের ওপর। তারা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গঠনে, আমদানি ব্যয় মেটাতে এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স অর্থনীতির জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল বৈদেশিক আয়ের উৎস। তবুও রেমিট্যান্স প্রেরণ প্রক্রিয়ায় তারা নানা জটিলতা, বিলম্ব, অতিরিক্ত খরচ এবং অনেক সময় প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হার না পাওয়ার সমস্যার সম্মুখীন হন। এর ফলে হুন্ডির মতো অবৈধ চ্যানেল অনেকের কাছে তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, যা বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।
রেমিট্যান্সকে ব্যাংক চ্যানেলে আনতে হলে কেবল প্রণোদনা ঘোষণা যথেষ্ট নয়। দ্রুত, স্বল্প খরচে ও প্রযুক্তিনির্ভর রেমিট্যান্স সেবা, প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ বিনিময় হার, প্রবাসী-বান্ধব ব্যাংক অবকাঠামো এবং প্রণোদনার সহজ ও সময়মতো বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি প্রবাসী কর্মীদের জন্য বিশেষ সঞ্চয়পণ্য, বিনিয়োগ সুযোগ, আবাসন ও পেনশন সুবিধা চালু করা হলে তারা আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার প্রতি আরও আস্থাশীল হবেন।
এছাড়া ফেরত প্রবাসীদের পুনঃএকত্রীকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত বিষয়। বিদেশে কাজ শেষে দেশে ফিরে তারা প্রায়ই কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও সামাজিক পুনঃস্থাপনে সমস্যার মুখে পড়েন। দক্ষতা স্বীকৃতি, পুনঃপ্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা সহায়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে ফেরত প্রবাসীরা অর্থনীতির জন্য একটি বড় সম্পদে পরিণত হতে পারেন। এটি ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেও সহায়ক হবে।
সবশেষে বলা যায়, ব্যাংক খাত ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা কোনো বিচ্ছিন্ন বা খণ্ডিত নীতিগত পদক্ষেপে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ক্ষুদ্র আমানতকারী ও প্রবাসী রেমিট্যান্স প্রেরণকারীরা এই দুই ব্যবস্থার মূল ভরকেন্দ্র এবং নীরব চালিকাশক্তি। তাদের অর্থ, শ্রম ও আস্থার ওপরই পুরো আর্থিক ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে। তাই ব্যাংকগুলোর জনগণের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও নৈতিক দায়িত্ব নিশ্চিত না করলে এবং প্রকৃত অবদানকারীদের সুরক্ষা ও সম্মান না দিলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না। এই নীরব অবদানকারীদের সুরক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই হতে পারে আর্থিক সুশাসন ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি।



