তথ্য প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা ও বাংলাদেশে অন্তর্ভূক্তিমূলক ব্যাংকিং এর বিকাশ

April 28, 2020
finbislesh
855
Views

তথ্য প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা ও বাংলাদেশে অন্তর্ভূক্তিমূলক ব্যাংকিং এর বিকাশ
(বর্ণিক বার্তায় ২০১৮ সালে প্রকাশিত)

                                                                                            -ড. শাহ্ মোঃ আহসান হাবীব

বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের সাথে সঙ্গতি রেখে অন্তর্ভূক্তিমূলক ব্যাংকিং সেবার প্রচলন ও এর বাস্তবায়নের প্রয়াস চলছে বেশ জোরেশোরে। আর, একটি উন্নয়নশীল দেশ তথা বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে অর্থনৈতিক অর্ন্তভূক্তি এবং গ্রামীণ উন্নয়নের গুরুত্ব সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত। এ ক্ষেত্রে অনেক সফলতার মাঝেও একথা সত্য যে, দেশের মানুষের একটি অংশ এখনো ব্যাংকিং সেবার আওতার বাইরে আছে, তবে তাদেরকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় এনে অর্থনৈতিক অন্তভ‚ক্তি নিশ্চিত করার পরিস্থিতি তৈরী করা হয়েছে। দেশের বিশেষতঃ গ্রামীণ স্বল্প আয়ের জনগণকে আর্থিক সেবার আওতায় এনে গ্রামীণ তথা দেশের সার্বিক উন্নয়নে বড় ধরণের পরিবর্তন আনা সম্ভব। এরপরও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এখনো দেশের ব্যাংকিং খাতের ঋণ ও ব্যাংকিং সুবিধা মূলতঃ ব্যবহার করছে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী এবং বড় ও মাঝারী শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো। নি¤œবিত্ত সাধারণ জনগণ এবং ছোট শিল্প ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এখনো পর্যন্ত ব্যাংকের ঋণ ও অন্যান্য সুবিধা যথেষ্ট পরিমাণে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি বা সেক্ষেত্রে বড় ধরণের পরিবর্তন আনার সুযোগ রয়েছে। তবে, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের প্রচেষ্টায় এবং কিছু ব্যাংকের বিশেষ দক্ষতায় সামগ্রিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। বিশেষতঃ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক খাত সম্পর্কিত সকল নীতিমালায় এ বিষয়গুলো যথাযথভাবে প্রতিস্থাপন করেছে এবং বাংলাদেশে নি¤œ-আয়ের মানুষ ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং খাতের সেবার আওতায় আনার জন্য উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এহেন পদক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের বেশ কিছু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেশের পশ্চাৎপদ জনগণকে আর্থিক সেবার আওতায় আনার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ব্যাংকিং খাতের এসব কার্যক্রম ও পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই আর্থিক অন্তর্ভূক্তি ও গ্রামীণ উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। এ ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশী লক্ষণীয় পরিবর্তন এনেছে ব্যাংকিং সেবায় তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার। মনে করা হচ্ছে তথ্যনির্ভর ব্যাংকিং সেবা অন্তর্ভূক্তিমূলক ব্যাংকিং এর বিকাশে বড় ধরণের পরিবর্তন বয়ে আনবে সামনের দিনগুলোতে।

আর্থিক অন্তর্ভূক্তির প্রথম পদক্ষেপ হয়ে থাকে ব্যাংকিং খাতকে সম্পৃক্ত করে আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করা। বিশেষতঃ মোবাইল ব্যাংকিং সেবা স্বল্প সময়ের মধ্যে নি¤œ আয়ের মানুষের কাছে অর্থ লেনদেনের সহজ মাধ্যম হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং ইতোমধ্যে অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে গ্রামীণ জনজীবনে এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে ইতিবাচক প্রভাব রেখেছে। বিশেষতঃ মোবাইল ব্যাংকিং এর সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে আর্থিক অর্ন্তভূক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে বড় ধরণের পরিবর্তন আনা সম্ভব। এ ধরণের লেনদেন বা পেমেন্ট সেবা একেবারে ব্যাংকিং কার্যক্রমের সংজ্ঞার মূল স্থপতি না হলেও সার্বিকভাবে আর্থিক সেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এক্ষেত্রে মোবাইল ব্যাংকিং বলতে আমরা সব ধরণের ব্যাংকিং কার্যক্রমকে বুঝি না। শুধু মাত্র মোবাইল ব্যবহার করে লেনদেন কার্যক্রম বা অর্থ স্থানান্তরকে বুঝিয়ে থাকি। এ পর্যন্ত ১৯টি ব্যাংকে অনুমতি প্রদান করা হলেও ১৮টি ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু করেছে। বিভিন্ন সেবার মধ্যে ব্রাক ব্যাংকের ‘বিকাশ’ এবং ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ‘রকেট’ মোবাইল আর্থিক সেবা বাজারে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। মার্চ, ২০১৮ সালের মধ্যে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৬ কোটি ছাড়িয়ে গেছে, যার মধ্যে সচল ব্যবহারকারী’র (একটিভ ইউজার) সংখ্যা দুই কোটি’র ও বেশী। এতো দ্রæত গতিতে মোবাইল ব্যাংকিং এর বিস্তার আর্থিক লেনদেনকে সহজতর করেছে এবং আর্থিক অর্ন্তভূক্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। দৈনন্দিন কেনাকাটা, ব্যবসা -বাণিজ্য এবং জীবনযাপনে বিশেষতঃ স্বল্প আয়ের মানুষের মাঝে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বিস্তারের প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। এ আর্থিক সুবিধার প্রকৃত প্রভাব এবং পরিবর্তন গ্রামীণ অর্থনীতিকে পাল্টে দিয়েছে। যে গতিতে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বিস্তার লাভ করছে তাতে আশা করা যায় অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের জনগণকে সম্পূর্ণভাবে আর্থিক খাতে অন্তর্ভূক্ত করা সম্ভব। এটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক এবং উৎসাহব্যঞ্জক হলেও একথা মনে রাখা প্রয়োজন মোবাইল আর্থিক সেবার অন্তর্ভূক্তি প্রকৃত আর্থিক অন্তÍর্ভূক্তির প্রথম ধাপ। এখন সময় এসেছে সার্বজনীন আমানত ও ঋণ সেবা বিস্তারে তথ্য প্রযুক্তিকে ব্যবহার করা এবং সম্পূর্ণ আর্থিক অন্তর্ভূক্তি নিশ্চিত করা।

আর্থিক অর্ন্তভূক্তি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দারিদ্রতা দূরীকরণের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। দেশের একটি বড় অংশকে এখনো বিদ্যমান ব্যাংকিং আমানত ও ঋণ সেবার আওতায় আনা যায়নি। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বেশ কিছু ব্যাংকের পদক্ষেপের পরেও একটি বড় অংশের নি¤œ আয়ের মানুষ ব্যাংকিং সেবার আওতায় আসলেও, তাদের ব্যাংকের ঋণ সেবার আওতায় আনার জন্য ব্যাপক পরিবর্তন প্রয়োজন। কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঋণ ও আমানত সেবা ব্যতীত আমাদের মত দেশে একটি টেকসই ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের বেশীর ভাগ জনগণ এখনো কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত, দেশের কৃষি ও গ্রামীণ খাতের প্রয়োজন অনুযায়ী খুব সামান্যই ঋণ সেবা প্রদান করতে পেরেছে। প্রকৃত পক্ষে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি এখনো অনেক ক্ষেত্রে মহাজন বা অপ্রাতিষ্ঠানিক ঋণের উপর নির্ভরশীল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ব্যাংকিং সেবা যেমন – বিশেষ ব্যাংক একাউন্ট, এসএমই ঋণ, ক্ষুদ্র ঋণ ইত্যাদি গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। এক্ষেত্রে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক গৃহীত পদক্ষেপগুলো লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন এনেছে। আর্থিক অন্তর্ভূক্তির প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক এজেন্ট ব্যাংকিং প্রচলনের অনুমতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর ব্যাংকিং এর ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়ের সূচনা। এজেন্ট ব্যাংকিং একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এজেন্ট ব্যাংকিং মূলতঃ সার্বিকভাবে সব ধরণের ব্যাংকিং বা আর্থিক সেবা যা একটি স্বয়ং সম্পূর্ণ বুথের মাধ্যমে সব ধরণের ব্যাংকিং সেবা প্রদান করতে পারে। অতি সম্প্রতি কয়েকটি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করেছে – যার ফলে তথ্য প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং এর পরিসর আরো বাড়ছে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে সহজে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেয়া শুরু হয়েছে। যদিও দেশের মোট ১৭টি ব্যাংক ইতোমধ্যে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করেছে তাদের মধ্যে যারা সাম্প্রতিক সময়ে জোরেশোরে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার বিস্তারে কাজ করছে তাদের মধ্যে ব্যাংক এশিয়া; দি সিটি ব্যাংক এবং ডাচ-বাংলা ব্যাংকের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দেশের প্রথম এ সেবা চালু করেছে ব্যাংক এশিয়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, এর গ্রাহক সংখ্যা ১৮ লাখে পৌঁছেছে- যার মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশের অধিক গ্রাহক প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকার। একটি অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক দিক হলো মোট গ্রাহকগণের প্রায় ৪০ শতাংশ মহিলা। জুন, ২০১৮ পর্যন্ত মোট এজেন্ট এর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫,০০০ এর উপর যারা দুই হাজার কোটি টাকার অধিক আমানত সংগ্রহ করতে সমর্থ হয়েছেন এবং ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা। ঋণের বিচারে হয়তো এ পরিমাণ তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু নয়। তবে, এটি একটি চমৎকার শুরু। প্রকৃতপক্ষে এজেন্ট ব্যাংকিং এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো সুযোগ তৈরী করেছে গ্রামে তাদের সেবা বিস্তারের। সরকারী ভাতা বিতরণ এবং পরিষেবা বিল আদায় করার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ঋণ ও আমানত সংগ্রহে এজেন্ট ব্যাংকিং জোরালো ভ‚মিকা রাখতে পারে। কিছু কিছু ব্যাংক চলতি, সঞ্চয়ী, স্থায়ী আমানতসহ ছোট আকারের ক্ষুদ্র, এসএমই ও আবাসন ঋণও এজেন্ট এর মাধ্যমে স্বল্প পরিসরে দেয়া শুরু করেছে। এমনকি এজেন্ট ব্যাংকিং এর মাধ্যমে সারাদেশে কার্ড ব্যবসাকেও ছড়িয়ে দেবার প্রচেষ্টা চলছে, যার আওতায় অদুর ভবিষ্যতে উপজেলা পর্যায়ে কার্ডের বিতরণ ও ব্যবহার এবং দোকানে দোকানে “পয়েন্ট অব সেলস” ব্যবহার করে গ্রামীণ মানুষকে কেনাকাটা করতে দেখা যাবে বলে আশা করা যায়।

ব্যাংকিং খাতে তথ্য প্রযুক্তি ও মোবাইল ব্যবহারের একটি বড় সুবিধাভোগী হলো রেমিট্যান্স সেবা গ্রহণকারী। একথা অনস্বীকার্য যে, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্য নিশ্চিতকরণে অত্যন্ত জরুরী। আর এক্ষেত্রে যারা মূলতঃ অবদান রাখছে তারা হলো মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার কিছু দেশে কর্মরত বাংলাদেশের স্বল্প দক্ষ শ্রমিক এবং এর বড় অংশটি গ্রামীণ নি¤œ আয়ের মানুষ। প্রকৃতপক্ষে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমেই রেমিট্যান্স সেবাকে এতো দ্রæততর এবং কার্যকর করা সম্ভব হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই ‘হুন্ডি বা অবৈধ উপায়ে’ অর্থ প্রেরণের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে। বিশেষতঃ মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে ঘরে বসেই এ ধরণের সেবা গ্রহণ করার সুযোগ পাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর রেমিট্যান্স সেবা প্রায় সম্পূর্ণভাবে শাখা ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতা থেকে বেরিয়ে এসে তথ্যপ্রযুক্তি ভিত্তিক ব্যাংকিং সেবায় রূপান্তরিত হয়েছে।

ডিজিটাল ব্যাংকিং আর্থিক সেবা প্রদানের পাশাপাশি এ সংক্রান্ত শিক্ষা, সচেতনতার বিকাশে বিশেষ ভ‚মিকা রাখছে। যে শাখার মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো স্বল্প আয়ের গ্রামীণ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারেনি, সে কাজটি বাস্তবায়নে অনেক দূর এগিয়েছে মোবাইল ও এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা। আজকের গ্রামীণ এবং স্বল্প আয়ের মানুষ আর্থিক সেবা গ্রহণের পাশাপাশি এ সংক্রান্ত তথ্য ও জ্ঞান আহরণের সুযোগ পাচ্ছে ঘরে বসে বা নিজের এলাকাতেই। গ্রামীণ কিছু স্কুলেও ব্যাংকিং সেবা চালু করা হয়েছে -যা আর্থিক সেবা সংক্রান্ত শিক্ষার বিকাশে ভ‚মিকা রাখছে। এছাড়া তথ্য নির্ভর আর্থিক সেবা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক তথা দেশের সম্পদ ব্যবহারের বিবেচনায় পরিবেশবান্ধব এবং সবুজ ব্যাংকিং এর আওতাভ‚ক্ত। বলা হয়ে থাকে অনলাইন ব্যাংকিং সবুজ ব্যাংকিং এর প্রাথমিক ধাপ। বর্তমানে বাংলাদেশে সবুজ অর্থায়নের বেশীর ভাগ গ্রাহক গ্রামীণ স্বল্প আয়ের জনগণ, যা আর্থিক অন্তর্ভূক্তির বিকাশে ভ‚মিকা রাখছে।

তথ্য প্রযুক্তি ভিত্তিক ব্যাংকিং সেবার বিকাশে প্রকৃত অর্জন নিশ্চিত করতে হলে সব ধরণের ব্যাংকিং সেবা অর্থাৎ আর্থিক লেনদেন, ঋণ ও আমানতের সার্বিক বিকাশের বিকল্প নাই। এবং এর মাধ্যমেই সত্যিকারের আর্থিক অন্তর্ভূক্তির মাধ্যমে অর্থনৈতিক অন্তর্ভূক্তির চ‚ড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে এখন সময় এসেছে তিনটি ব্যাংকিং পণ্যকে আলাদাভাবে বিবেচনায় এনে কার্যকরী কৌশল বাস্তবায়নের। প্রকৃত আর্থিক অন্তর্ভূক্তি নিশ্চিত করার জন্য এ পর্যায়ে আর্থিক অন্তর্ভূক্তির তিন ধরণের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। প্রথমতঃ আর্থিক লেনদেনে অন্তর্ভূক্ত জনগণ, দ্বিতীয়তঃ আমানতে অন্তর্ভূক্ত জনগণ এবং তৃতীয়তঃ ঋণে অর্ন্তভ‚ক্ত জনগণ। লেনদেন ও আমানত সংগ্রহে শুধু মাত্র তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারই বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ এক্ষেত্রে সফলতার মূল নিয়ামক হলো সেবার দ্রæততা ও মান। কিন্তু ঋণ প্রদান, তার কার্যকরী ব্যবহার এবং আদায়ের জন্য সেবার দ্রæততা ও মানের পাশাপাশি আরো বেশ কিছু নিয়ামক গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখে। যা অর্জনের জন্য বিশেষ কৌশলের প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়। এক্ষেত্রে ব্যাংকিং সেবা কিভাবে কিছু কিছু শোষণমূলক অপ্রাতিষ্ঠানিক ঋণ ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য ও জনপ্রিয় করা যেতে পারে সেটাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, অর্šÍভূক্তিমূলক আর্থিক সেবার দ্রæত উন্নয়নে এবং স্বল্প আয়ের মানুষদের কাছে আর্থিক সেবা নিয়ে পৌঁছানোর মাধ্যম হিসেবে তথ্য প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিং সেবাকে উৎসাহিত করতে হবে। মোবাইল ফোনের ব্যাপক ব্যবহার মোবাইলভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা ব্যবহারের ক্ষেত্রকে সহজসাধ্য করলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এ ধরণের আর্থিক সেবাকে ব্যাংকের সাথেই সম্পৃক্ত থাকতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে মোবাইল এজেন্টের মাধ্যমে অবৈধ উপায়ে রেমিটেন্স প্রবাহের কিছু পর্যবেক্ষণ এ সংক্রান্ত ঝুঁকিকে নীতিনির্ধারকদের উদ্বিগ্ন করেছে এবং এ ক্ষেত্রে বালাদেশ ব্যাংক তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। স্পষ্টতঃ মোবাইল বা ব্যাংকিং এজেন্টের মাধ্যমে খুব সহজে নি¤œ আয়ের জনগোষ্ঠী এবং প্রত্যন্ত এলাকার মানুষদের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছাতে হবে, এবং এ ধরণের সার্বিক কর্মকান্ডকে আর্থিক সেবা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার নজরদারীতে থাকারও প্রয়োজন আছে। বিশেষতঃ মোবাইল এবং অন্যান্য ব্যাংকিং এজেন্টদের অবশ্যই যথাযথ নজরদারী ও দায়বদ্ধতার আওতায় রাখা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎপরতা প্রশংসনীয়। যেমন ২০১৭ সালে মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে অবৈধ লেনদেন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে দৈনিক ক্যাশ ইন ২৫,০০০ থেকে নামিয়ে ১৫,০০০ টাকা করা হয়েছে এবং ক্যাশ আউট ২৫,০০০ থেকে কমিয়ে ১০,০০০ টাকা করা হয়েছে। এছাড়া মাসিক ক্যাশ ইন এর পরিমাণ ১,৫০,০০০ থেকে কমিয়ে ১,০০,০০০ টাকা এবং ক্যাশ আউট ১,৫০,০০০ থেকে কমিয়ে ৫০,০০০ করা হয়েছে। এ ধরণের নিয়ন্ত্রণ স্বল্প আয়ের মানুষের আর্থিক লেনদেনের প্রয়োজনীয়তা মেটানোর ক্ষেত্রে কোন বাঁধা সৃষ্টি করবে বলে মনে হয় না। অন্যদিকে অবৈধ লেনদেনকারীরা নিরুৎসাহিত হবে বলে আশা করা যায়। এছাড়া এ সংক্রান্ত মানি লন্ডারিং এর প্রতিরোধে ইতোমধ্যে দেশে কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ২০১৭ সালে মোবাইল সেবা বিষয়ক এন্টি মানি লন্ডারিং ও টেররিস্ট ফাইন্যান্সিং বিষয়ক আইন সংক্রান্ত একটি গবেষণা প্রকাশ করেছে। এখানে উল্লেখ্য যে, এ বিষয়ে ‘ফিনানসিয়াল একশন টাস্ক ফোর্স’ (এফএটিএফ) ২০০৬ সাল থেকেই কার্যক্রম শুরু করেছে এবং ২০১০ সালে একটি বিশেষ প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে।

মোবাইল বা এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা ‘ছায়া বা শ্যাডো ব্যাংকিং’ এর সংজ্ঞার আওতাভ‚ক্ত। ‘ছায়া ব্যাংকিং’ অবৈধ বা অনৈতিক কোন ব্যাংকিং বা আর্থিক সেবা নয়। কিন্তু ব্যাংকের মূল কার্যক্রম যেভাবে সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রিত এবং পর্যবেক্ষণের আওতাভ‚ক্ত তেমনটি নয়। এক্ষেত্রে যেহেতু ব্যাংকের পাশাপাশি অন্যপক্ষ যেমন মোবাইল কোম্পানী বা এজেন্টদের (যারা আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয় এমন) সম্পৃক্ততা থাকে, সেহেতু ব্যাংকের মতো করে তাদেরকে কঠোর আইন, নিয়ম ও পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা সম্ভব নয়। প্রকৃতপক্ষে তার প্রয়োজনও নেই। কারণ কঠোর আইনের প্রয়োগ ও বাধ্যবাধকতা এ ধরণের উদ্যোগকে ব্যাহত করতে পারে। তবে এ ধরণের কার্যক্রমকে অবশ্যই নির্দিষ্ট কিছু নির্দেশক অনুসারে পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখতে হবে। সেক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাশাপাশি যে সমস্ত ব্যাংক এ ধরণের কার্যক্রমে জড়িত তাদের ভ‚ূমিকাও অত্যন্ত জরুরী। বিশেষতঃ এজেন্ট নির্বাচনে ব্যাংকের অত্যন্ত বেশী সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। অবশ্য ইতোমধ্যে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর তৎপরতা অত্যন্ত ইতিবাচক। এছাড়া তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। বিশেষতঃ নতুন নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং এ সংক্রান্ত সচেতনতার অভাব অনেক বড় চ্যালেঞ্জ- যা মোকাবিলার মাধ্যমে সত্যিকারের আর্থিক অর্ন্তভ‚ক্তির সুফল অর্জনই আগামী দিনের ব্যাংকিং এর লক্ষ্য। ইতিবাচক নীতিমালা, কার্যকর আইন ও যথাযথ নজরদারীর ক্ষেত্রে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক তথ্যপ্রযুক্তির নির্ভর ব্যাংকিং এর বিকাশে যে ক্ষেত্র তৈরী করেছে, তার সদ্বব্যবহার করে বাংলাদেশের স্বল্প আয়ের সাধারণ জনগণকে আর্থিক অন্তর্ভূক্তির আওতায় আনা হবে- এটাই কাম্য।

লেখক বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব্ ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) এর অধ্যাপক ও পরিচালক প্রশিক্ষণ হিসেবে কর্মরত আছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *