সত্তরের দশকে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত

April 28, 2020
1191
Views

সত্তরের দশকে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত
(বর্ণিক বার্তায় ২০১৮ সালে প্রকাশিত)
-ড. শাহ্ মোঃ আহসান হাবীব
১৯৭১ সালের মহান মুুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে তৎকালীন সরকারের প্রধানতম লক্ষ্য হয়ে ওঠে অর্থনীতিকে দাঁড় করানো এবং এর পূর্নগঠন। আর এ লক্ষ্য অর্জনে একটি সমর্থনমূলক আর্থিক এবং ব্যাংকিং খাত প্রতিষ্ঠা এবং পূর্নগঠন অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের মূল চার নীতির ভিত্তিতে ব্যাংকিং খাতের প্রতিষ্ঠানসমূহ জাতীয়করণ করা হয়। এ সময়ের ব্যাংকিং খাতের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশকে বর্ণনা করতে গেলে সমসসাময়িক বিশ্ব এবং আঞ্চলিক ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত পরিস্থিতি ; তৎকালীন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা এবং তা উন্নয়নের লক্ষ্য ও কৌশল ; এবং সার্বিকভাবে অর্থনীতির পূর্নগঠন এবং মৌলিক প্রয়োজনের দিকগুলোকে বিবেচনা করা প্রয়োজন। যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনীতির পূর্নগঠনে সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করাই ছিল সরকারের মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের লক্ষ্যে কৃষি ও শিল্পখাতের উন্নয়নকেও যথাযথভাবে গুরুত্ব না দেয়ার অবকাশ ছিল না। তৎকালীন সময়ের সম্পদের স্বল্পতা এবং আর্থিক সক্ষমতার কথা বিবেচনায় রেখে এবং সম্পদের সুষম বন্টনের লক্ষ্যে কলকারখানা এবং বড় বড় অবকাঠামো সরকারীকরণ অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত ছিল। আর ব্যাংকিং খাতের পূর্নগঠনও এ ধরনের রাষ্ট্রীয় নীতিকে বিবেচনায় রেখেই পরিচালিত হচ্ছিল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী তৎকালীন সরকার “বাংলাদেশ ব্যাংক জাতীয়করণ অধ্যাদেশ ১৯৭২” এর আওতায় ব্যাংকিং খাত পূর্নগঠন শুরু করে। স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের দুইটি শাখা অফিস এবং ১৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের উপস্থিতি ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে তৎকালীন স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের ঢাকা শাখাই “বাংলাদেশ ব্যাংক ” নামে স্বাধীন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে আর্বিভূত হয়। স্বাধীনতাপূর্ব ব্যাংকিং কার্যক্রম এদেশে অত্যন্ত সীমাবদ্ধ এবং সম্পূর্ণভাবে শহর এলাকায় কেন্দ্রীভূত ছিল। যার মধ্যে তিনটি বিদেশী এবং দুইটি বাংলাদেশীদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হতো। স্বাধীনতাপূর্ব ১২টি ব্যাংক একত্রিত করে ৬টি সরকারী ব্যাংকে রূপান্তরের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে ব্যাংকিং খাত যাত্রা শুরু করে। সোনালী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয় ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং ব্যাংক অব ভাওয়ালপুর লিমিটেড-কে একত্রিত করে; অগ্রণী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠা প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেড, হাবিব ব্যাংক লিমিটেড এবং কমার্স ব্যাংক লিমিটেড এর সমন্বয়ে ; জনতা ব্যাংক এর যাত্রা শুরু ইউনাইটেড ব্যাংক লিমিেিটড এবং ইউনিয়ন ব্যাংক লিমিেিটড এর সংযুক্তির মধ্য দিয়ে; রূপালী ব্যাংক স্থাপিত হয় মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংক এবং স্টান্ডার্ড ব্যাংক লিমিেিটডকে একত্রিত করে; পূবালী ব্যাংক কার্যক্রম শুরু করে অস্ট্রেশিয়া ব্যাংক এবং ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংককে একসাথে করে; এবং উত্তরা ব্যাংকের যাত্রা শুরু ইস্টার্ণ ব্যাংকিং কর্পোরেশন এর পরিবর্তিত নামে। এ সময়ে প্রতিটি ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ছিল পাঁচ কোটি টাকা । সোনালী ব্যাংক ছাড়া অন্য ৫টি তৎকালীন রাষ্ট্রায়াত্ব ব্যাংকের যাত্রা শুরু এক কোটি টাকা করে পরিশোধিত মূলধন দিয়ে। সোনালী ব্যাংক কার্যক্রম শুরু করে দুই কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন নিয়ে। এ ছয়টি রাষ্ট্রায়াত্ব ব্যাংকের বাইরে এ সময় বিদেশী ব্যাংকগুলোকে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার অনুমতি প্রদান করা হয়। এছাড়া শিল্প ও কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনের জন্য দু’টি বিশেষায়িত ব্যাংকের কবার্যক্রম শুরু করা হয়। ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ অনুসারে শিল্প ব্যাংক দীর্ঘ ও মাঝারি মেয়াদী শিল্প ঋণ প্রদানের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করে। সত্তরের দশকের ব্যাংকিং এর একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল বিশেষায়িত ব্যাংক অর্থাৎ কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কৃষক এবং জেলেদের মাঝে ঋণের প্রবাহ নিশ্চিত করা।বাংলাদেশের কৃষি ও গ্রামীণ খাতের উন্নয়নে স্বাধীনতাপূর্ব “পাকিস্তান কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ” “বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ” নামে কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে- যা ১৯৭৩ সালে একটি রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশের বলে “বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ” নামে আবির্ভূত হয়। বীমা সেবার রাষ্ট্রীয়করণ করা হয় এবং সমবায় ঋণ পদ্ধতি এবং ডাক বিভাগের সঞ্চয় ব্যবস্থা চালু করা হয় মূলতঃ ক্ষুদ্র ও নি¤œ আয়ের গ্রামীন জনগোষ্ঠীর কথা মাথায় রেখে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সত্তর দশকের ঋণ ব্যবস্থার মূল কার্যক্রম ছিল বৈদেশিক বাণিজ্যে এবং সরকারী বিনিয়োগে অর্থায়ন। বিভিন্ন প্রকাশিত তথ্য অনুসারে সত্তরের দশকে চারভাগের তিনভাগ ব্যাংক ঋণ রাষ্ট্রায়াত্ব ও বৈদেশিক বাণিজ্য খাতে প্রবাহিত হতো।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঋণ প্রবাহের জন্য এই দশকেই সরকারী ব্যাংকগুলো শাখা বিস্তার শুরু করে। সত্তরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে মোট ১২টি ব্যাংকের শাখার সংখ্যা ১৬০০ ছাড়িয়ে যায় এবং ১৯৮০ সালে এর সংখ্যা দাড়ায় ৩৮০০ এর উপরে। এই শাখা বিস্তারে রাষ্ট্রায়াত্ব বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোই মূলতঃ ভূমিকা রাখে, যা ছিল মোট ব্যাংকিং শাখার প্রায় ৮৮ শতাংশ। বিশেষতঃ সত্তরের দশকের শেষের দিকে ব্যাংকিং খাতের গ্রামীণ শাখার সংখ্যা খুব জোরেশোরে বাড়ানোর প্রচেষ্টা চালানো হয়। এ ক্ষেত্রে ওই সময়ে গ্রামীণ অর্থনীতিকে ঋণ প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকও বিশেষ তহবিল গঠন করেছিল।
ব্যাংকিং খ্যাত পূর্নগঠনের প্রাথমিক বছরগুলোতে ব্যাংক পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক দক্ষতার অভাব লক্ষ্যণীয়। সাধারণভাবে ঋণ প্রস্তাব মূল্যায়ন এবং তার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোতে কার্যকরী ব্যবস্থা ছিল না। একই সাথে দক্ষ জনবলের অভাব ছিল । ব্যাংকিং খাতে ঋণ তত্ত¡াবধান, আদায়, হিসাব নীরিক্ষণ এবং সঠিক প্রণোদনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ঘাটতি ছিল। যার প্রভাব পড়ে ব্যাংক ঋণের আদায়ের হার এবং ব্যাংকিং খাতের সার্বিক সক্ষমতার উপর। সার্বিকভাবে আমানত ও ঋণের সুদের হার ছিল বেশ কম এবং ব্যাংক রেট ছিল আমানতের হারের তুলনায় বেশী। আমানত ও সুদের হারের পার্থক্য ছিল বেশ বেশী। ‘বাণিজ্যিকভাবে লাভের জন্য ব্যাংকিং’; ‘ব্যাংকিং খাতে তারল্য ব্যবস্থাপনা’; ‘ঋণ বিতরণে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা’ বিষয়গুলো ব্যাংকিং খাতে অজানা ছিল বা প্রয়োগ করা হতো না। প্রকৃতপক্ষে সঞ্চয় এবং বিনিয়োগের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে ব্যাংকিং খাতকে এ সময়ে খুব একটা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। মুদ্রাস্ফীতির বিবেচনায় সুদের হার ছিল ঋণাত্মক। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে এ দশকে আমানতকারীদের উৎসাহিত করার জন্য যথেষ্ট প্রণোদনা প্রদান করা সম্ভব হয়নি। নির্দেশিত এবং সরকারী খাতে ঋণের প্রভাব এবং বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত হওয়ার সার্বিক পরিবেশ এ দশকে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। বিশ্ব ব্যাংকিং খাত পরিস্থিতি বিবেচনায় এ পরিস্থিতি কোনভাবেই তুলনীয় না হলেও ব্যাষ্টিক অর্থনীতি ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতার বিচারে সার্বিক ব্যাংকিং খাত পরিস্থিতি একেবারেই অনাকাঙ্খিত ছিল না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারীর অভাব এবং ব্যাংকিং পরিচালনার বিশ্ব পর্যায়ের মানদন্ডের ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত ছিল। অবশ্য বিশ্ব ব্যাংকিং খাত পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সত্তরের দশক উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অনিশ্চয়তা ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাংকিং খাতের প্রসারের প্রচেষ্টার জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ সময়টাতে বিশ্ব ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং নজরদারীর দূর্বলতাগুলো বিশেষভাবে নজরে আসে এবং জি-১০ এর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ব্যাংকিং খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতা আনয়নে বিশেষ কার্যক্রম শুরু করে।
অনাদায়ী ঋণের সংস্কৃতি শুরু হয় সত্তরের দশকেই। তৎকালীন অর্থনীতির বিকাশের জন্য ঋণের প্রবৃদ্ধি যেমন অত্যন্ত জরুরী ছিল, ব্যাংকিং খাতের দক্ষতা অর্জন করে সে পরিমাণ ঋণ প্রবাহ নিশ্চিত করা একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সার্বিকভাবে অর্থনীতির প্রয়োজনের সাথে তাল রেখে এবং অনেক সীমাবদ্ধতার মাঝে সত্তর দশকের ব্যাংকিং খাত আশানুরূপ ভিত্তি তৈরী করতে পারে নি। হয়তো বা যুদ্ধ পরবর্তী পরিস্থিতিতে স্বল্প সময়ে এমনটা আশা করাটাও সমীচিন ছিল না। তবে এর মাঝে অনাদায়ী ঋণের বৃদ্ধি ও একটি অংশের ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ ফেরত না দেয়া ব্যাংকিং খাতের জন্য বোঝা হয়ে দাড়ায়। এ সময়ে ব্যাংক পরিচালনা সংক্রান্ত বেশ কিছু আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন শুরু হলেও প্রয়োগের দূর্বলতা, ব্যাংকিং কার্যক্রমে অনাকাঙ্খিত হস্তক্ষেপ সত্তর দশকের শেষের দিকে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। আপাতঃদৃষ্টিতে মূলতঃ আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং অনেক ক্ষেত্রে ঋণবিতরণে অব্যবস্থাপনার কারণেই অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ ক্রমশঃ বৃদ্ধি পেতে থাকে।

ব্যাংকিং খাতে দক্ষ জনবলের অভাব বিশেষভাবে অনূভূত হয়েছে সত্তরের দশকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী ব্যাংকিং খাতের পূনর্গঠন এবং ব্যাংকিং খাতে দক্ষ জনবল তৈরী করার মানসে বিআইবিএম প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৯৭৪ সালে। প্রথম বারের মত প্রায় এক হাজার ব্যাংকার নিয়োগ করা হলেও নবনিযুক্ত অফিসারবৃন্দের প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, প্রশিক্ষক কোন কিছু ছিল না। এ পর্যায়ে বিভিন্ন ব্যাংকের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তার সমন্বয়ে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের প্রশিক্ষণের চাহিদা পূরণের যাবতীয় কর্মকান্ড সম্পাদনের জন্য একটি “টাস্ক ফোর্স” গঠন করা হয়। টাস্ক ফোর্স সদস্যবৃন্দ ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফেরার পর স্থায়ী একটি প্রশিক্ষণ অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে বিআইবিএম-এর কার্যক্রম নবনিযুক্ত ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
সত্তরের দশকের ব্যাংকিং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতি এবং কৌশল পরিবর্তনের সাথে সাথে একটি সহায়ক খাতের ভূমিকা পালন করার প্রচেষ্টা চালিয়েছে। তবে সার্বিক বিবেচনায় সত্যিকারের বাণিজ্যিক ব্যাংকিং খাত হিসেবে বিকশিত হতে পারেনি-যা আর্থিক খাত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করায়।

লেখক বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) এর অধ্যাপক ও পরিচালক (প্রশিক্ষণ)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *