করোনা যুদ্ধ পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দা ও আর্থিক অস্থিতিশীলতা

April 29, 2020
521
Views

করোনা যুদ্ধ পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দা ও আর্থিক অস্থিতিশীলতা
অধ্যাপক শাহ্ মোঃ আহসান হাবীব
বিশ্ব অর্থনীতিগুলো করোনা যুদ্ধে আর সাথে সাথে এগিয়ে আসছে অর্থনৈতিক মন্দা। করোনা যুদ্ধের কৌশল হিসেবে সামাজিক দূরত্ব এবং ভ্রমণ নিয়ন্ত্রণকে এখন পর্যন্ত কার্যকরী বলে মনে করা হচ্ছে। সরকার ও নীতি নির্ধারকরা এ কৌশল অবলম্বনের পাশাপাশি, আক্রান্তদের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করছে এবং নি¤œ আয়ের মানুষ ও ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগীতায় এগিয়ে আসার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তবে এর ফলস্বরূপ অর্থনৈতিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে অথবা অনেকক্ষেত্রে বন্ধ হচ্ছে। এতে ধীরে ধীরে বিশ্ব অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে সমূহ অর্থনৈতিক মন্দার দিকে। দীর্ঘকালীন বড় বিপর্যয় থেকে বাঁচার কৌশল হিসেবে এ স্বল্পকালীন অর্থনৈতিক ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবার কোন উপায় আছে বলে মনে হয় না। উপরন্তু, করোনা যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রকৃত ফলাফল এখনও নিশ্চিত নয় যা বর্তমান পূর্বাভাস এর তুলনায় অনেক বেশী ভয়াবহ হতে পারে। সেক্ষেত্রে বিশ্ব অর্থনৈতিকে বাচাঁনোর কৌশল পরিবর্তিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
বিশ্ব অর্থনীতির মোট উৎপাদন সামনের মাসগুলোতে উল্লেখযোগ্য হারে কমবে বলে মনে করা হচ্ছে। এ করোনা পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দার ফলাফল সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক মন্দাকে হার মানাবে বলে পূর্বাভাস এ ব্যক্ত করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে বা বন্ধ হয়ে গেছে বিশ্বব্যাপী অনেকাংশে। উৎপাদন ধারা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে ও হচ্ছে এবং ব্যাবসার প্রতি আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্ব মুদ্রা তহবিলের সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে ডিসেম্বর, ২০১৯ এর তুলনায় বর্তমানে উৎপাদন ও খুচরা বিক্রয় বিপুল হারে কমেছে। উৎপাদন কমে যাবার সাথে সাথে সামনের সময়গুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম এর উপর প্রভাব পড়বে যদি না এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়। সার্বিক বিবেচনায় চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতি ২০২০ সালে সারা বিশ্বকে গ্রাস করবে। জে.পি মর্গান এর একটি সাম্প্রতিক পূর্বাভাস এ বলা হচ্ছে, বছরের দ্বিতীয় তিন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের দেশীয় উৎপাদন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশীয় উৎপাদন যথাক্রমে ১৪ ভাগ ও ২২ ভাগ হারে কমবে। সমস্ত লক্ষণ প্রকৃতপক্ষে একটি সমূহ অর্থনৈতিক মন্দার ঈঙ্গিত প্রদর্শণ করছে যা স্বাভাবিক নিয়মে আর্থিক অস্থিতিশীলতায় রূপান্তরিত হতে চলেছে।
উৎপাদন ও ব্যবসা বানিজ্য বন্ধের প্রাথমিক প্রভাব পড়েছে তারল্য সংকটের মধ্য দিয়ে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানা তাদের সরবরাহকারীদের মূল্য পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছে, বেতন পরিশোধ করতে পারছে না এবং ব্যাংক এর ঋণ এর কিস্তি দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। যদিও এ সমস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সফলভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। সুতরাং করোনা পরবর্তী পরিস্থিতিতে যে তাঁরা স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে আসতে পারবে তার ঈঙ্গিত স্পষ্ট। সুতরাং এ সময়টাতে এসমস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরী। বিশেষত- ছোট আকারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠাগুলো ইতিমধ্যেই আর্থিক দৈন্যদশার মাঝে পড়েছে, এবং সামনের মাসগুলোতে বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এমন আর্থিক দৈণ্যতার মধ্যে পড়তে হতে পারে। স্বাভাবিভাবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এ পরিস্থিতিতে মন্দ ঋণ, এ সংক্রান্ত অতিরিক্ত জমা এবং ব্যাংক মূলধনের ঘাটতি রোধে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক গুলো এগিয়ে এসেছে। যার ফলে ব্যাংকগুলো ঋণ পরিস্থিতি সামলে নিলেও আমানতের ঘাটতি ব্যাংক তারল্যে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। কারণ, অনিশ্চয়তার কারনে আমানতকারীরা অধিক পরিমাণ অর্থ নিজের কাছে সংরক্ষণ করছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর এমন অবস্থান ও সহায়তা স্বল্পকালীন পর্যায়ে আর্থিক খাত এর জন্য সহনীয়। এছাড়া সরকার ও বিভিন্ন দেশে সাধারণ মানুষ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা শুরু করেছে বা এ সংক্রান্ত ঘোষণা দিয়েছে। এধরনের বিশেষ সহায়তা এবং ব্যবস্থা যে কোন দেশের জন্য দীর্ঘকালীণ পর্যায়ে বিপত্তিকর। বিশেষত স্বল্প আয়ের এবং অনেক উন্নয়নশীল দেশের সরকারের জন্য তা সম্ভবপর নয়।
আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন এবং বিশ্ব বানিজ্য ক্ষতির মুখে পড়েছে, চীনে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হবার পর থেকেই। গত দুই দশকে চীন বিশ্ব বানিজ্যে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। শুধুমাত্র তৈরি পণ্যের রপ্তাণীকারক হিসেবে নয়, চীন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মধ্যবর্তী পণ্য সরবরাহকারী দেশ যা শিল্প উৎপাদনের জন্য একান্ত জরুরী। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় জোট, জাপান, কোরিয়াসহ অনেক দেশের শিল্প উৎপাদন এবং বৈদেশিক বানিজ্য মারত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মধ্যবর্তী পণ্য সরবরাহের অভাবে। এছাড়া অনেক উন্নয়নশীল দেশ বহুলাংশে তাদের আমদানীর জন্য চীনের উপর নির্ভরশীল। প্রকৃতপক্ষে বিশ্ব বানিজ্যের সকল বড় শক্তিগুলো ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক বানিজ্যে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিশ্ব আন্তজার্তিক বানিজ্যে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সরাসরি সম্পর্কিত। আন্তর্জাতিক বানিজ্য সংকোচন মানে হলো, ব্যাংকগুলোর এ সংক্রান্ত আর্থিক সেবার সংকোচন। বিশ্ব বানিজ্য সংকোচনের সাথে সাথে ব্যাংকিং খাত বড় ধরণের আয়ের উৎসও হারাচ্ছে যা এ বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্থিতিকে মারত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
আর্থিকভাবে ব্যাংকিং সেবার সংকোচন ধীরে ধীরে প্রকাশিত হচ্ছে। ব্যাংকিং সেবার সময়কাল কমানো হয়েছে এবং সামাজিক ও ব্যক্তিগত দূরত্বের সীমাবদ্ধতার আওতায় স্বল্পসংখ্যক গ্রাহককে সেবা প্রদান করছে ব্যাংক। অনেক ধরনের ব্যাংকিং সেবা বিনামূল্যে দেয়া হচ্ছে এবং ঋণ পরিশোধের কিস্তির সময়সীমা বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে ব্যাংকগুলো। ঋণ ফেরতের অনিশ্চয়তা ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পর্যায়ের ঋণের ক্ষেত্রে বেশী। বিশেষত একটি অংশের ব্যক্তি পর্যায়ের ঋণগ্রহীতা ইতিমধ্যে চাকুরি হারিয়েছে। অনলাইন ও মোবাইল ব্যাংকিং এর চাহিদা বেড়েছে যথাযথ কারণে, কিন্তু এ সংক্রান্ত অনেক সেবা বিনা মূল্যে দিতে বাধ্য হচ্ছে সেবা প্রদানকারী ব্যাংক ও কোম্পানীগুলো। সার্বিকভাবে এ পরিস্থিতি ব্যাংকের ঋণ সেবা ও ফি সেবা সংক্রান্ত আয়ের জন্য হুমকির কারণ, যা সম্পূর্ণ আর্থিক খাতকে হুমকির মূখে ঠেলে দিয়েছে।
যেকোন অর্থনৈতিক ক্ষেত্র এবং আর্থিকখাতের যে কোন অংশের সমস্যার প্রতিফলণ ব্যাংকিং খাতে দেখা যায়। যেমন, ইকুইটি, বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড ইত্যাদি বাজারের আস্থিতিশীলতার প্রভাব ব্যাংকিং বাজারে পড়ে। শেয়ারবাজার এর উপর অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের নেতিবাচক প্রভাব সাথে সাথে প্রতিফলিত হলেও ব্যাংকিং খাতে তা একটু সময় নিয়ে প্রভাব ফেলতে শুরু করে এবং তা দীর্ঘ সময় ধরে আর্থিক খাত ও অর্থনীতির বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশগুলোতে শেয়ার বাজারের ধস ইতিমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির চিন্তার কারণ হয়েছে। আর সামনের সময়গুলোতে ব্যাংকিং খাতে তার প্রভাব বেশ বড় আকারে প্রতিফলিত হবে এমনটাই পূর্বাভাস গুলোতে উঠে এসেছে। উন্নয়নশীল দেশের ব্যাংক ভিত্তিক আর্থিক খাতের জন্য এমন ধাক্কা সামলানো আরো বেশী কঠিন যেখানে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বেশীর ভাগ ব্যাংকিং খাত নির্ভর।
করোনা যুদ্ধের ঘটনাচক্র নির্দেশ করছে যে, অর্থনৈতিক প্রভাব আস্তে আস্তে আর্থিক তথা ব্যাংকিং খাতে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে । অর্থনৈতিক মন্দার আর্থিক অস্থিতিশীলতায় রূপান্তর বা আর্থিক মন্দার অর্থনৈতিক নেতিবাচক প্রভাব সবসময়ই অনুমেয়।
বিশ্বব্যাপী মুদ্রানীতি কর্তৃপক্ষ বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকিং খাতের তারল্য ও অন্যান্য সমস্যা চিহ্নিত করে ইতিমধ্যেই ব্যবস্থা নেয়া শুরু করেছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের সরকারও অর্থনীতি ও আর্থিক খাতকে বাচাঁনোর লড়াইয়ে বড় অংকের অর্থ সাহায্যের ঘোষণা করেছে ও করছে। তবে নীতি নির্ধারকগণের কার্যক্রম ও কৌশল এর কার্যকারীতা ও ফলাফল এখনও নিশ্চিত নয়। যেহেতু করোনা পরিস্থিতির ক্ষতির পরিমাণ এখন পর্যন্ত অনুমাননির্ভর মাত্র। বর্তমানে চীন ও উন্নত বিশ্ব করোনা যুদ্ধে মারত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত। করোনা ভাইরাসের সরাসরি প্রভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কি পরিমাণ মানুষ প্রান হারাবে তা অনিশ্চিত। তবে করোনা যুদ্ধ পরবর্তী অর্থনৈতিক ও আর্থিক মন্দা উন্নত ও উন্নয়ন বিশ্বকে মোটামুটি একইভাবে গ্রাস করবে বলে মনে হয়। বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এ পরিস্থিতি সামাল দেয়া বেশ কঠিন হবে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় অনেক উন্নয়নশীল দেশ এখনও সেভাবে প্রস্তুতি কার্যক্রম শুরু করেনি, যা উন্নত বিশ্বে যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে বা তারা দেখতে বাধ্য হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, করোনা যুদ্ধের লড়াই এর পাশাপাশি যুদ্ধ পরবর্তী প্রস্তুতির বিকল্প নাই। এজন্য প্রকৃত বর্তমান ও সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ পরিমাপ করার কাজ এগিয়ে নিতে হবে স্বচ্ছতার সাথে। নীতিনির্ধারকদের সকল অংশীদারী পক্ষের ও নাগরিকগনের অর্থনৈতিক ও আর্থিক ক্ষতির বিবেচনায় নিজেকে প্রস্তুত করার সময় এখন। এ যেন করোনা যুদ্ধ জয়ের পর ভালভাবে বাচাঁর জন্য আরেক বড় যুদ্ধের প্রস্তুতি ।
এ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে অর্থনীতি এবং আর্থিক খাত রক্ষায় মুদ্রানীতি কর্তৃপক্ষ নয় বরং সরকারকে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিতে হবে যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুধুমাত্র সহযোগী হিসেবে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *